বাবার স্মৃতিসত্তা - আমার কথা - সিদ্ধার্থ গৌতম


১.
একটি পরিণত বটগাছের দিকে তাকালে বিষ্ময়ে চোখ ভরে ওঠে। কী অপূর্ব আভিজাত্যে সে তার ডালপালাগুলো ছড়িয়ে দেয়। সম্ভ্রমে অধিকার করে আশেপাশের সমস্ত ভূমি আপন শাখামূলে! সত্যি তার ব্যাপ্তি কতোটা প্রশস্ত লক্ষ না করলে বোঝা যায় না। একটা বটগাছ শুধু বটগাছ নয়; অসংখ্য প্রাণকে আচ্ছাদনকারী একটি মাধ্যমও বটে! যতোটা সে নিজে ছড়ায়, ততোটাই আশ্রয় বাড়তে থাকে তার ওপর যারা নির্ভর করে। অসংখ্য পাখি বটগাছকে ঘিরে তাদের সংসার সাজায়। তাদের সংসার বড় হয়, বাচ্চারা একসময় মা-বাবা হয়। এভাবে একটা গাছকে কেন্দ্র করে কিছু পরিবারের জীবনচক্র চলতে থাকে। বাবা হচ্ছেন একটা পরিবারের সেই বটগাছ যাকে ঘিরে একটা পরিবারের পুরো অবকাঠামো সৃষ্টি হয়। ঐ অনেকটা নিউক্লিয়াসের মতো! আমার মতো বা আমাদের মতো মধ্যমশ্রেণির মধ্যবিত্ত পরিবারে যাদের জন্ম; তাদের গল্পগুলো মোটামুটি একইরকমের বিশেষকরে চাকুরিজীবী পরিবারগুলো অন্তঃকথা। ঐ যে বলে না গল্পগুলো একই আসলেই তাই। একই গল্প, কিন্তু প্রত্যেকের মতো গল্প, তাই এক হয়েও আলাদা, ভিন্নস্বাদের গল্প। প্রত্যেকটা পরিবারই তো আসলে আলাদা রসায়নের; কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। তারপরও গল্পগুলো কোথাও যেন একটা মালা গাঁথে।
.

Father;s Day Bangladesh
২.
আমার বাবার জন্ম ১৯৫২ সালে। পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা নাটোর জেলাতেই। মাধ্যমিক শেষ করার কিছু পরেই (বাবা তখন উচ্চ মাধ্যমিক-এ ভর্তি) মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অন্য পরিবারগুলোর মতোই প্রাণ রক্ষার্থে আমাদের পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। কর্পদহীন অবস্থায় একটা ভিন্ন দেশে গিয়ে অসম্ভব এক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয় আমাদের পরিবার। বাবা সেই প্রতিকূলতাকে নিজের মতো করে সামলে নিয়েছিলেন। এক অসামান্য যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে সেই সময়কে অতিক্রম করেছিলেন তিনি। যুদ্ধ শেষে বিজয়বেলায় আবার তারা ফিরে আসেন বাড়িতে। কিন্তু সাজানো বাড়ি আর আগের মতো ছিল না। পুরো বাড়ি-ই লুণ্ঠিত হয়েছিল। আমার ঠাকুরমা (দাদী) দেশত্যাগের সময় সামান্য কিছু সোনার গহনা আর টাকাপয়সা নিতে পেরেছিলেন। আঁচলের খুঁট খুলে সেগুলোই তিনি বের করে দেন। বাবার পড়াশোনা তখনও শেষ হয়নি। ভীষণ প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। সে সময় বাজারে মার্কিন কাপড় (ক্রীম কালার মোটা সুতির কাপড় বিশেষ) পাওয়া যেতো সুলভ মূল্যে। সেই কাপড়ের দুই সেট পাঞ্জাবি পায়জামা বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেটা পরেই কলেজ করতেন। কলেজ করে টিউশনি সেরে একবারে বাড়িতে আসতেন। স্বাধীনতার পর এভাবেই শুরু হয়েছিল বাবার জীবন। বি.কম.(স্নাতক) শেষ করে আর পড়াশোনা চালাতে পারেননি বাবা। চাকরির খোঁজে তাঁকে বেরিয়ে পড়তে হয়। তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় একই সময়ে চাকরি হয়েছিল বাবার তিনি ‘পাট অধিদপ্ত’-এ যোগদান করেছিলেন। বাবা মনে করেন জীবনের এই সিদ্ধান্তটি তিনি ভুল নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তখন যারা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোতে যোগদান করেছিল তারা প্রায় সবাই নিয়মিত প্রমশনে বেশ বড় পদে থেকে অবসরে গেছেন। ব্যাংকে যোগদানের সুযোগ তাঁরও হয়েছিল, কিন্তু সেটি তিনি গ্রহণ করেন নি। এই বিষয়টি নিয়ে আমি এখনও বাবার মধ্যে হতাশা দেখি। আসলে পাটের স্বর্ণযুগ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার কারণে চাকুরি নিয়ে বাবার যে উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল সেটি পূরণ হয়নি। ১৯৮১ সালে আমার মা-বাবার বিয়ে হয়। আমি জন্মগ্রহণ করি ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। আমার জন্ম হয়েছিল নাটোরের মিশন হাসপাতালে পৌষমাসের ১৩ তারিখ ভোরবেলায়। যে সময়ে আমাদের মহল্লার সব বাচ্চার জন্ম হয়েছিল বাড়িতে স্থানীয় ধাত্রীদের অধীনে। তখন আমার ঠাকুরমা প্রায় একক সিদ্ধান্তে আমার মাকে একটি ভালো হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। বাবা আমার জন্মের সময় থাকতে পারেননি। তিনি পরে এসেছিলেন। আমার শৈশবের প্রথম চারবছর কেটেছিল নওগাঁয়। বাবা তখন নওগাঁতে বদলি। বগুড়া ও ঠাকুরগাঁ ছাড়া উত্তরবঙ্গের সবকটি জেলায় তিনি চাকরি করেছেন। বদলি হলে তিনি সানন্দে নতুন জায়গায় চলে যেতেন। আমার যখন ৪ বছর বয়স, তখন আমার মা আমাকে নিয়ে নাটোরে চলে আসেন। তারপর এখানেই বড় হয়েছি আমি।
.
৩.
আমাদের পড়াশোনা নিয়ে ভীষণরকম সিরিয়াস ছিলেন বাবা। সবসময় বলতেন “ আমাদের তো জমিজমা বা সম্পত্তি কিছুই নেই। পড়াশোনাই হলো আমাদের একমাত্র পুঁজি। ভালোকরে পড়ো।” আমি প্রথমে ‘নাটোর গ্রিন একাডেমি’ পরে গভ.বয়েজ স্কুলে ভর্তি হই। বাবা তাঁর চাকরিক্ষেত্র হতে কখনও ১৫ দিন পর আবার কখনও ১ মাস পর দুদিনের জন্য আমাদের কাছে আসতেন। যখনি আসতেন আমার পড়ার খোঁজ করতেন। ইংরেজি গ্রামার আমি পুরোটাই শিখেছি বাবার কাছে। পড়া না পারলে মারও খেতাম। আস্তে আস্তে আমি বড় হয়ে উঠলাম; বাবার কাছে আমার পড়ালেখার পাঠও ফুরিয়ে এলো। ইংরেজি হাতের লেখা শিখেছিলাম বাবার কাছে; বাংলা হাতের লেখা পিসিমণির (ফুফু) কাছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমার প্রতিদিনের পড়ালেখার ভার সামলাতেন পিসিমণি। আমি স্লেট ও পেন্সিলে লেখা শিখেছিলাম। সেখান থেকে কাঠপেন্সিল, তারপর ফাউন্টেন পেন ও বলপয়েন্ট পেন। ফাউন্টেন পেন কিনে দিয়েছিলেন বাবা। কলমটির নাম মনে পড়ে না আমার। সঙ্গে কিনে দিয়েছিলেন এভারেডি কালি। দোয়াতটা এখনও আছে। বাবা সাদা কাগজে বড় বড় করে ঘর কেটে আমাকে লেখা শেখাতেন। বাবার ঐ স্টাইল অনুকরণ করেই পিসিমণিও আমাকে লেখা শেখাতেন। কলম ভালো করে ধরতে পারতাম না বলে প্রায়ই নিব নষ্ট হতো। বাবা আবার সেগুলো ঠিক করে আনতেন। আমার হাত কালিতে মেখে যেতো; কাপড়ে কালি লাগতো। তখন অবশ্য বলপয়েন্ট কলমও পাওয়া যেতো। আমি প্রতিদিন বলতাম “কেন আমাকে বলপয়েন্ট কলম কিনে দেয়া হয় না।” বাবা সবসময় বলতেন “কালি-কলম দিয়ে লেখো। লেখা সুন্দর হবে।” ফাউন্টেন পেনের প্রতি এভাবেই আমি অনুরাগী হয়ে উঠি। বাড়িতে বাবার অনুপ্রেরণাতেই আমি ফাউন্টেন পেন দিয়ে লিখতাম।


বাবার খুব প্রিয় কলম ছিল ‘পার্কার ৪৫’। ইংরেজিতে ভালো ছিলেন বলে বাবার মাস্টার মশাই (লাল স্যার) বাবাকে কলমটা দিয়েছিলেন। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি কলমটা পেয়েছিলেন। এই কলম দিয়েই তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। খুব নাকি যত্ন করতেন কলমটার। কিন্তু ১৯৭৯-৮০ সালে ঢাকায় অফিসের কাজে এসে সেটা তিনি হারিয়ে ফেলেন। ঐ একই রকম কলম তিনি আর খুঁজে পাননি। কাছাকাছি একটা পেয়েছিলেন, ওটা দিয়েই লিখতেন। এই কিছুদিন আগে তিনি আবার কলমের প্রসঙ্গ তুললেন। বর্ণনা শুনে বুঝলাম ওটা স্টিল নিব এবং ফিলিং সিস্টেম অনেকটা পাইলট কন ৭০-র মতো। এমন একটা কলম আমি বহুদিন ধরে খুঁজছি, কিন্তু এখনও পাইনি। পেলে তাঁর হাতে দিতাম।।
.
৪.
বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক যে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ, তা নয়। উনি একটু মেজাজি মানুষ। অবশ্য স্ট্রোক করার পর এখন আর তেমন মেজাজ নেই। প্রতিদিন তার সঙ্গে অল্প কথা হয় আমার। কেমন আছ; শরীর কেমন এই জাতীয় কথা আর কি! বাড়িতে গেলে এখন কিছু কিছু বিষয়ে তিনি আমার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। বেশিরভাগই পারিবারিক, ধর্মপুস্তক অধ্যয়ন আর ফুটবল খেলা সম্পর্কিত। এখন আর রাত জেগে খেলা দেখতে পারেন না বলে খুব আফসোস করেন। তাঁর জীবন-যাপন এখন একেবারেই বাঁধাধরা। সকালে ওঠেন, ঘন্টাখানেক হাঁটেন, জলখাবার খান, ঔষধপত্র খেয়ে আবার কিছুক্ষণ ঘুমান। দুপুরের খাবারের পর আরেকবার বিশ্রাম নেন। বিকেলের দিকটায় এখনও টুকটাক ঘরের কাজ করেন। ভীষণ টিপটপ মানুষ বাবা। তাঁর জামাজুতো এখনও ধবধবে চকচকে থাকে। ভাঁজবিহীন কাপড় তাঁকে কোনোদিনই পড়তে দেখিনি। কমদামি কাপড় পরেন, কিন্তু ক্যালেন্ডার করা কাপড় ছাড়া কোনোদিনই পরেন না। প্রতিদিন সময় নিয়ে আস্তে আস্তে ঘরের আসবাবপত্র মোছেন। নওগাঁয় তাঁর সঙ্গে কুমিল্লার এক কাঠমিস্ত্রির পরিচয় হয়েছিল। তার হাতে বানানো বেশকিছু আসবাবপত্র এখনও আমাদের বাড়িতে চকচক করছে। অবশ্য সেগুলো বাবার হাতের গুণে এখনও নতুন আছে।


একজন সীমিত আয়ের মানুষ হয়েও বাবা আমাদের প্রায় সব প্রয়োজনই মিটিয়েছেন। আমরা দু ভাই পড়াশোনা শেষ করে এখন চাকরি করি। কিন্তু বাবাকে খুব জোর করেও কিছু দেয়া যায় না। বলেন “পেনশন আর গ্রেচুইটি দিয়ে তোমাদের মা আর আমার অনেক ভালো চলে যায়। তোমরা বরং তোমাদের দায়িত্ব নাও এবং সন্তানদের ভালোভাবে বড় করো।”


আমি বাবার জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। তাঁর আত্মনির্ভরশীল সত্তা এখনও তাঁকে সমান আত্মবিশ্বাসী করে রেখেছে। এটা দেখে আমার অভিমান হয় আবার ভালোও লাগে। তবে পার্কার কলমটার জন্য তার মধ্যে এখনও আফসোস আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশত্যাগকালে কলমটা তিনি সম্বল হিসেবে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি বেশ কয়েকবার তাঁকে একটি গোল্ডনিব কলম কিনে দিতে চেয়েছি, কিন্তু তিনি নেন নি। তখন বুঝলাম পার্কার কলমটি সত্যিই তাঁর স্মৃতিসত্তা ঘিরে আছে।

সিদ্ধার্থ গৌতম 

সহকারী অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

উদ্যোক্তাদের গল্প - কালির দোয়াত – Kali’r Dowat
উদ্যোক্তাদের গল্প - কালির দোয়াত – Kali’r Dowat
ঝর্ণা কলম যারা নিয়মিত ব্যবহার করি, তাদের মাঝে নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী কলমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট বাছাই করে নেয়ার চাহিদা থাকে,...
Read More
Best Gift For Your Dad This Father's Day
Best Gift For Your Dad This Father's Day
Father's day is coming up and you're still wondering how your dad always manages to gift you exactly what you needed ...
Read More
About Foutain Pens
About Foutain Pens
Fountain pens may seem downright intimidating and mysterious at first, but I assure you they are so much more fun tha...
Read More

Leave a comment


Please note, comments must be approved before they are published